fbpx

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

Pinterest LinkedIn Tumblr +

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ একখানা তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হতে চলেছে। সত্তরের দশকে জাস্ট ফ্যালাণ্ড ও জন পার্কিন্সন নামে দুই অর্থনীতিবিদের লেখা বই ‘বাংলাদেশ: এ টেস্ট কেস অফ ডেভেলপমেন্ট’ এ এই একই কথা বলা হয়েছিল।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

হেনরি কিসিঞ্জার। ছবি: সংগৃহীত

এরপর সময় গড়িয়েছে, ৭১-এর রক্তাক্ত বুড়িগঙ্গা মজে গেছে। পশ্চিমা উন্নয়নের মডেল আকড়ে ধরে বাংলাদেশ কেবল এগিয়েছে। পশ্চিমা দুর্নীতি ইনডেক্সে বাংলাদেশ শীর্ষে থাকে, পরিবেশ দূষণেও থাকে, ঢাকা হয়ে ওঠে বায়ু দূষণে শীর্ষ নগরী। সবুজ আচ্ছাদনের কথা না হয় বাদই গেল। এই এত ‘নেই’-এর পরেও বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য। কারণ বাংলার সাধারণ মানুষ। প্রতি বছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে যারা। তারা কি আর দেশকে তলানিতে ফেলে রাখে?

২০১৮ সালের ১৬ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের দিন গণনা। অবশ্য এর জন্য বাংলাদেশকে তিনটি পূর্বশর্ত পূরণ করে আসতে হয়েছে। এই উত্তরণপর্ব আগামী ছয় বছর মনিটর করবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।

বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার পর স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরিতে ঠাঁই পায়। আশা ছিল খুব জলদি পরের দশ বছরে উন্নয়নশীল দেশের তকমা মিলবে। তবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা আর তার পরের সামরিক শাসকদের রিলিফ, সাহায্য, অনুদান, ঋণ ও শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা নিতে এই স্বল্পোন্নত পরিচয় বেশ কাজে দেয়। অবশ্য ১৯৭৪ সালেও যে দুর্নীতি ছিল না এমনটা ভাবার কারণ নেই যেখানে খোদ বঙ্গবন্ধুই বলছেন- ‘আমি সারা দুনিয়া থেকে বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য ভিক্ষা করে আনি আর তা সাবাড় করে দেয় চাটার দল।’

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

তাঁর সত্যভাষণ শোনেনি যেন কেউই। ছবি: সংগৃহীত। ছবি: সংগৃহীত

সামরিক শাসনের সময়ে বৈদেশিক ঋণ আর সহায়তাকে মহিমান্বিত করা হয়েছিল। ফলে একটা সময়ে সেটা ১৩.৭% এ উপনীত হয়। মার্কাস ফ্রাণ্ডা তার বইয়ে লিখেছেন, এক স্বৈরশাসক বারবারই বলার চেষ্টা করতেন, ‘এ দেশে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের দুর্নীতিকে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাস্তবতার মতো স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতে হবে।’ এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতি সূচকের শীর্ষে থাকে। গত দশ বছরে পরিস্থিতির খানিক উন্নতি হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এখনও সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার।

গত শতকের সাত ও আটের দশকের ঐ দুর্দশা ও বিশ্বভিক্ষুকের দীনহীন অবস্থা থেকে বাংলাদেশের যে চমকপ্রদ অর্থনৈতিক উত্থান, তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করে চলেছে কৃষি খাত, রপ্তানি খাত, রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র ঋণ আর তথ্য-যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

দেশের তৃণমূলে পৌঁছেছে প্রযুক্তি। ছবি: সংগৃহীত

অবকাঠামো উন্নয়নেও দেশ পিছিয়ে নেই। বিশ্বব্যাংকে নিকুচি করে নিজস্ব অর্থায়নে তৈরির পথে পদ্মা সেতু। পিছিয়ে থাকা দেশের দক্ষিণ বদলে যাবে এর বাস্তবায়নে।

বাংলাদেশ ২০১২ সাল থেকে ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। মিঠাপানির মাছ চাষে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। শাক-সবজি উৎপাদনেও পরনির্ভর নয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতেই ১৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্যের বিশাল মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের ৮১ শতাংশ রপ্তানি আয় হচ্ছে। যাতে শ্রমরতদের বেশিভাগই নারী। যারা ছিলেন পর্দার আড়ালে বহু বছর। পাট ও চামড়ার পণ্যের বাজারে ধ্বস নামলেও ওষুধ, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণ ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি আশা জাগানিয়া।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

কৃষিখাতে দেশের অর্জন ফেলে দেবার নয়। ছবি: সংগৃহীত

২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪০.৫৩ বিলিয়ন ডলার। প্রায় দেড় কোটি মানুষের রেমিট্যান্স এসে জমা হচ্ছে প্রতি বছর ব্যাংক ও অন্যান্য মাধ্যমে। যার পরিমাণ ২২-২৫ বিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে দরিদ্রসীমার নিচে রয়েছে ২০% মানুষ, যেখানে ২০০০ সালে ছিল ৪৪%। ১৯৮১-৮২ সালে জিডিপি অনুপাতে বিদেশি সাহায্য ছিল ১৩.৭%। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটা কমে এক-পঞ্চমাংশের নিচে নেমে এসেছে। কোভিডের আগে পর্যন্ত, প্রতি বছর বাংলাদেশ লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে ক্রমান্বয়ে। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি করোনার আগেও ছিল ৭.২৮ শতাংশ। অবশ্য আয় ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রবণতা রয়েছে একটি গোষ্ঠীর। সুষম বন্টন ছাড়া এই সমস্যা নিরসনের নয়। যতই বিতর্ক থাক, ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য গ্রামের ভূমিহীন নারীদের আলো দেখিয়েছে। তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে।

অবহেলিত নারী শক্তির ক্ষমতায়ন দেশে ঘটেছে উল্লেখ করার মতো। শহুরে নারী, গ্রামীণ নারী সবার জীবনমানেই এসেছে পরিবর্তন।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

একসময়ে দেশে অকল্পনীয় ছিল এমন চিত্র। চালিকাশক্তি রূপে নারীর এমন ছবি এখন বাস্তবতা। ছবি:সংগৃহীত

পোশাক শিল্পের মাধ্যমেও নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। বাংলাদেশের ১৩ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছেন। এর ভেতর ছয় কোটি মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এর প্রভাব দেশের কৃষি, শিক্ষা, উদ্ভাবন, আউসোর্সিংয়েও পড়ছে।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

গার্মেন্টখাতে শ্রমরতদের অধিকাংশই নারী। ছবি: সংগৃহীত

জনাব হেনরি কিসিঞ্জার, আপনার বয়স হয়েছে। ৯৭টি বসন্ত দেখে ফেলেছেন। আশা করি আরও তিনটি বসন্ত দেখার সৌভাগ্য আপনার হবে। দয়া করে আরও তিনটি বছর বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন প্লিজ। ২০২৪ সালে আপনার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ হবে, তখন আপনার চেহারাটা একবার হলেও দেখতে চাই।

লেখক : আল মারুফ রাসেল। জন্ম ১৯৮৬ সালের ২৩ নভেম্বরে পুরনো ঢাকায়। শৈশব-কৈশোর কেটেছে কলাবাগানে। পড়াশোনা প্রত্নতত্ত্ব ও আলোকচিত্র নিয়ে। সাংবাদিকতার শুরু ২০০৫ সালে সমকাল পত্রিকায়। পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছেন সুন্দরবন বাঘ প্রকল্প ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার অ্যাণ্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন)-এ। তিনি ‘দ্য বঙ্গ প্রজেক্ট’ নামে একটি ইতিহাস গবেষণা উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। আলোকচিত্রেও আগ্রহী আল মারুফ রাসেল একইসঙ্গে ‘হেরিটেজ ওয়াক ঢাকা’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

দেখতে পাচ্ছেন মিস্টার কিসিঞ্জার?

আল মারুফ রাসেল

 

Share.

Leave A Reply