fbpx
BBS_AD_BBSBAN
৪ঠা ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯ | পরীক্ষামূলক প্রকাশনা

বাঙালির স্ফুরণের একুশ আজ

Pinterest LinkedIn Tumblr +
Advertisement

“For millions of years mankind lived just like the animals
Then something happened which unleashed the power of our imagination
We learned to talk…”

প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, বিশ্ববিজ্ঞানতাত্ত্বিক স্টিফেন হকিংয়ের এই বিখ্যাত উক্তি দিয়েই শুরু হয়েছে জনপ্রিয় বৃটিশ রকব্যান্ড পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘কিপ টকিং’ গানটি। গানটির প্রথম লাইনগুলোতে বলা হয়েছে-

“আমাকে ঘিরে রয়েছে একটি নীরবতা
আমি সহজভাবে ভাবতে পারছি না
আমি একটা কোণায় বসে আছি
কেউ আমাকে বিরক্ত করতে পারছে না আমার মনে হয় এখন আমার কথা বলা উচিত…।”

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অন্যান্য পশুদের মতোই জীবন-যাপনের পর মানুষ কথা বলতে শিখেছে, যা এখন তার অন্যতম মৌলিক অধিকার। আর এই বৈশিষ্ট্যই অন্যান্য প্রাণিদের থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে জোরদার করে। মনের ভাব প্রকাশের জন্য কথা বলাটা জরুরি। কথা বলা মানেই হচ্ছে মনের ভাব আদান-প্রদান হিসেবে আমরা যা বলে থাকি। এর অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা।

মানুষ শব্দ উচ্চারণ করে ভাষার মাধ্যমে তার মনের ভাব কবে বা কত বছর আগ থেকে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল তা আজও অব্দি সঠিকভাবে নিধার্রণ করা যায় না। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, এক সময় মানুষ ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতো। পরবর্তী সময়ে এক ধরনের শব্দ উচ্চারণ করে যা অনেকটা এখানকার দিনের চিৎকার বলা যায়, মূলত এর মাধ্যমে প্রকাশিত হতো মানুষের মনের ভাব।

অনুশীলনতার মাধ্যমে কালক্রমে এই চিৎকারই পরিবতির্ত হয় আজকের ভাষার রূপ লাভ করে। মানুষ একপর্যায়ে এসে শব্দের মাধ্যমে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে, আর এই শব্দগুলোই মানুষের ভাষা হিসাবে পরিগণিত হয়ে ওঠে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ বিভিন্ন ধরনের শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে মনের ভাবের আদান-প্রদান করতো। তাই দেখা যায়, পৃথিবীর একেক অঞ্চলের মানুষ একেক ধরনের ভাষায় কথা বলে। ভাব প্রকাশের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো নিজের মাতৃভাষাতে কথা বলা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষেরই তার নিজের ভাষায় কথা বলার পূর্ণ অধিকার আছে, তেমনই অন্য ভাষা এবং সেই ভাষায় কথা বলা মানুষদের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানানোও প্রতিটা মানুষের জন্য আবশ্যিক।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ২০১০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর এই দিনটিতে বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনে বিশ্বব্যাপি মাতৃভাষা দিবস পালনের উৎসব প্রতিটা বাঙালির জন্যই অত্যন্ত গৌরবের। এই গৌরব অর্জনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে, যখন বাঙালিরা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল। এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল বাঙালিরা, যা সারা বিশ্বের প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষের কাছে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে অনুপ্রেরণার খোরাক হয়ে উঠেছে।

ভাব প্রকাশের জন্য মানুষ নিজের প্রয়োজনে ভাষার গতি সময়ে সময়ে বদলে নেয়। বাংলা ভাষায়ও এমন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া আর গণমাধ্যমের প্রভাবে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ। কালের পরিক্রমায় অনেক শব্দই ঝরে যাবে আবার কিছু শব্দ টিকে থাকবে। গ্রহণ কিংবা বর্জন যাই হোক না কেন এটাই সত্য ভাষার এই পরিবর্তন চলবে নিরন্তর।

ভাষার সৃষ্টির শুরুতে মানুষ যে শব্দ দ্বারা ভাব প্রকাশ শুরু করেছিল, সেগুলোতে যেমন পরিবর্তন এসেছে; আমাদের পূর্বজনদের ভাষা থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মুখের অথবা লেখার ভাষাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। মাতৃভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি আমরা এখন সহজভাবে বোধগম্য শব্দগুলিকেই আমাদের দৈনন্দিন ভাষার চর্চাতে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। সেখানে নিজের ভাষার শব্দাবলীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা বিদেশি ভাষাও। পৃথিবীতে ইন্টারনেটের একটি বড় ধরনের বিপ্লব ঘটেছে। মানুষ যে কোনো সহজ জিনিস সবার আগে গ্রহণ করে নেয়। ভাষার ক্ষেত্রেও একই পথ অবলম্বন করছে এ প্রজন্ম। যোগাযোগ সহজ রাখার জন্য যে কোনো ভাষাকে গ্রহণ করা এখন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

ভাষাকে ক্রমশ জাতিত্বের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করার কারণে ভাষাগত অধিকারগুলি ভাষার ইতিহাস জুড়ে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাসের প্রাথমিক ভাষা এবং কার্যকরী ভাষা নীতিগুলি এখনো বেশ গোলমেলে। প্রায় প্রতিটা জায়গাতেই দেখা যায়, কোনো এক অঞ্চলের মানুষের উপর একটি ভাষা প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে অন্যান্য ভাষা বা উপভাষা উপেক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে বাংলাকে মর্যাদাকার আসনে বসিয়েছে তাই অন্য ভাষার প্রতিও মর্যাদাবান হওয়া বাংলা ভাষাভাষীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। অর্থাৎ পূর্ব প্রজন্ম মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে, তাই ভাষা আন্দোলনের সারথীদের পরবর্তী প্রজন্ম সব ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সেসব ভাষা রক্ষায় সক্রিয় হবে-এটা স্বাভাবিক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে আমরা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। আমাদের দায়িত্ব শুধু বাংলা ভাষাকে রক্ষা করা না। বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিদ্যমান সকল ভাষাকেই এর সঠিক মর্যাদা দেওয়া। কিন্তু তা কি আমরা পারছি? বরং আদিবাসীদের উপর আমরা বাংলা ভাষাকে চাপিয়ে দিচ্ছি, যা পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে উর্দুকে চাপিয়ে দিয়ে করতে চেয়েছিল। এটি ভাষা আন্দোলনের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।

যারা ভাষা আন্দোলন করেছিলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সামনে বড় প্রশ্নটি ছিল মাতৃভাষা বাংলার। প্রাথমিকভাবে ভাষা আন্দোলনটি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে অনেক মাত্রা। ভাষা শুধু মানুষের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়, ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতিরও প্রসার হয়।

কবি নির্মলেন্দু গুণ তার এক কবিতায় বলেন, ‘এই বর্ণমালা পৌছে দিতে চাই ভূমিহীনের ঘরে…।’ রক্তে পাওয়া বর্ণমালায় সর্বজনীন শিক্ষার আকুতি আছে এ চরণে। মাতৃভাষায় শিক্ষা আজও অপূর্ণ থেকে গেছে যুদ্ধে জয়ী দেশে। সাক্ষরতার হার এখনও সন্তোষজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। শহীদ মিনারে ফুল দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ প্রশ্নগুলো কম গুরুত্বের নয়। এ নিয়ে ভাবার সময় এখনই।

সংস্কৃতির বাহন হলো ভাষা। আমরা যদি বাংলা ভাষার অধিকারটি হারাতাম, তাহলে হয়তো বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা স্তব্ধ হয়ে যেত। তবে একেবারে থেমে যেত, তা কিন্তু নয়। কিন্তু মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে যে স্ফুরণটি থাকে, সেই স্ফুরণটি থাকত না। কাজেই বাঙালি সংস্কৃতির জন্য একটা বিপদসংকেত ছিল পাকিস্তানি সিদ্ধান্ত। ফলে বলা যায়, বাঙালির ভাষাভিত্তিক রাজনীতির কারণেই এই বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ হয়। একুশে ফেব্রুয়ারিকে তাই বলা যায় বাঙালির স্ফুরণের এক অবিনাশী দিন।

শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদ, ঐক্য ও সংহতির নামে সেই ১৯৪৮ সালে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্যের ভাষা। পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেদের মাতৃভাষার এই অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেনি। ফেটে পড়েছিল আন্দোলনে, দখল করে নিয়েছিল রাজপথ। জনবিরোধী রাষ্ট্র-মাত্রই নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায় তাদের মাইনে দিয়ে পোষা পুলিশ-নামক বাহিনী লেলিয়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে শহীদ হয়েছিলেন ৪ বীর বাঙালি। এই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা যেমন আমাদেরও প্রাণের ভাষা, তেমনই বেঁচে থাকার অবলম্বন, ভালোবাসার মাধ্যম, পূর্বসুরীর স্মৃতি, উত্তরসুরীর উত্তরাধিকার, ব্রতের ভাষা, ধর্মের ভাষা, রাজনীতির ভাষা- ঘাম ঝরানো কর্মের ভাষা, প্রেমের ভাষা, কান্নার ভাষা, এমনকি যৌনতারও ভাষা। আবার এই ভাষাই না বলা কথার ভাষা, ভুলে যাওয়া স্মৃতির ভাষা, আগামীকালের ভাষা এবং অবশ্যই মুক্তির ভাষা। তবে ভাষার জন্য রক্ত ঝরার ঘটনা শুধু আমরাই একমাত্র উদাহরণ নই। ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকায় ১১ টি তরুণ প্রাণ মাতৃভাষার জন্য শহীদ হয়েছিল ভারত রাষ্ট্রে। সেখানে মাত্র ১৬ বছর বয়সের কমলা ভট্টাচার্য্য শহীদ হোন। ১৯৭২ ও ১৯৮৬ সালে আরও তিন তরুণ প্রাণ আত্মবলিদান দেয় সেখানে।

বাঙালির স্ফুরণের একুশ আজ

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিদ্যমান সকল ভাষাকেই এর সঠিক মর্যাদা দেয়া কাম্য। কিন্তু তা কি আমরা পারছি? বরং আদিবাসীদের উপর আমরা বাংলা ভাষাকে চাপিয়ে দিচ্ছি, যা পাকিস্তানিরা আমাদের সঙ্গে উর্দুকে চাপিয়ে দিয়ে করতে চেয়েছিল। এটি ভাষা আন্দোলনের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। ছবি : সংগৃহীত

ভাষা হিসেবে বাংলা নির্যাতিত হয়েছে এক সময়। কিন্তু একইসঙ্গে এই ভাষাও কখনও কখনও দেখা দিয়েছে আধিপত্যবাদীর ভূমিকায়। অন্যের ভাষা অধিকার অস্বীকার করার ভূমিকায় এ ঘটনা অত্যন্ত লজ্জার যে ইংরেজ আমলে নিজেদের সর্বক্ষেত্রে আধিপত্যের সুযোগ নিয়ে বাঙালি পন্ডিতরা অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। এইসব জায়গার স্কুল ছিল বাংলা মাধ্যমের, অসমীয়া বা ওড়িয়া মাধ্যমের নয়। এমনকি সুদূর মণিপুরেও বৈষ্ণব আধিপত্যের হাত ধরে সেখানকে জনগণের ওপর বাংলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মানুষ যখন নিজের আবাসস্থলে নিজের ভাষাকেই প্রান্তিক হতে দেখে, তখন তাদের মধ্যে ক্রোধ জাগা স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের ভাষার অধিকার নির্বিচারে হরণ করা হয়েছে। চাকমা, ম্রো এবং আরও অনেক ভাষা আজ বাঙালির দাপটে গুটিয়ে গেছে। যে দেশের মাটি থেকে বিশ্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সেই মাটিতে যখন অন্যের ভাষা অধিকার এইভাবে কেড়ে নেওয়া হয়, প্রান্তিক করে দেওয়া হয় কারো কারো পরিচিতি, তখন সকল বাঙালির লজ্জিত হওয়া উচিত। অন্যের ভাষা অধিকার ও আত্মপরিচিতি কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাওয়ার জন্য বাংলার ভাষা সৈনিকেরা প্রাণ দিয়েছিলেন কি?

সবশেষে বলতে চাই, ভাব প্রকাশে কথা বলার বিকল্প নেই। প্রত্যেকেরই নিজের কথা বলার অধিকারটা নিশ্চিত করতে পারাই হওয়া উচিত ভাষা দিবসের মূলমন্ত্র। এই ২০২১ সালে এসেও যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় না বলতে হয়, “আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ।” প্রতিটা মানুষের হৃদয়ের কথা ব্যক্ত হোক নিজের ভাষাতে। মানুষ কথা বলতে পারুক প্রাণ খুলে!

লেখক : সিফাত বিনতে ওয়াহিদ,
কবি, লেখক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, প্রান্তবার্তা

Advertisement
Share.

Leave A Reply